রাজনীতি হারালে ইতিহাসও হারায় ভৈরবে প্রয়াত রাষ্ট্রপতির বাড়ি ঘিরে বিতর্ক
বিশেষ প্রতিবেদক
একসময় দেশের ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে সিদ্ধান্ত যেত এই বাড়ি থেকে। আওয়ামী লীগের রাজনীতি, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি, ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস—সব মিলিয়ে এটি শুধু একটি বাড়ি নয়, ভৈরবের ঐতিহ্য ও ইতিহাসের প্রতীক। কিন্তু এখন সেই প্রয়াত রাষ্ট্রপতি মো. জিল্লুর রহমানের ঐতিহ্যবাহী পৈত্রিক বাড়ি ‘আইভি ভবন’ ঘিরে চলছে তুমুল বিতর্ক।
ভৈরবপুর উত্তর পাড়ার হাজী বলাকি মোল্লার বাড়িতে অবস্থিত এই ভবনের নিচতলায় এখন চলছে সানফ্লাওয়ার কিন্ডারগার্টেন স্কুল। স্থানীয়রা বলছেন, এটি বিনা ভাড়ায় পরিচালিত হচ্ছে -বাড়িটি সচল রাখার উদ্দেশ্যে। কিন্তু অনেকের মতে, এটি “রাষ্ট্রীয় ও ঐতিহাসিক সম্পদের অবমাননা”।
রাজনৈতিক পালাবদলের পর নিঃশব্দ আইভি ভবন
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট, বাংলাদেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আওয়ামী লীগ ক্ষমতা হারায়। সেই সময় সারা দেশে দলীয় প্রতীক ও সম্পত্তির ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। সেই সময়েই আইভি ভবনে অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। এরপর ১৩ মাস ধরে বাড়িটি পড়ে ছিল পরিত্যক্ত, নির্জন ও অরক্ষিত অবস্থায়।
এই সময়ে প্রয়াত রাষ্ট্রপতির ছেলে, আওয়ামী লীগের সাবেক সাংসদ ও বিসিবি সভাপতি নাজমুল হাসান পাপন রাজনৈতিক মামলার কারণে দেশ ত্যাগ করেন। তিনি এখনো দেশে ফেরেননি, এমনকি স্থানীয় রাজনীতি বা পরিবারের সম্পত্তি ব্যবস্থাপনাতেও কোনো ভূমিকা রাখছেন না বলে অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়রা বলছেন, পাপনের অনুপস্থিতিতেই বাড়িটি কার্যত “নির্বাহী মালিকবিহীন” অবস্থায় পড়ে ছিল।

বিতর্কিতভাবে স্কুল স্থাপন
গত অক্টোবরের শুরুতে জিল্লুর রহমানের বড় মেয়ে তানিয়া বাখতের অনুরোধে তাঁর চাচাতো ভাই শেরদিল নাঈম বাড়িটি সংস্কার করে সেখানে সানফ্লাওয়ার কিন্ডারগার্টেন চালু করেন। এই স্কুলটি ১৯৮৭ সালে এখান থেকেই যাত্রা শুরু করেছিল, তবে পরবর্তীতে পাশের ভবনে স্থানান্তরিত হয়।
স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক আব্দুল বাসেত বলেন, “আমরা কোনো বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে আসিনি। আইভি ভবনই ছিল স্কুলের জন্মস্থান। ভবনটি যেন নষ্ট না হয়, সে জন্যই আমরা ফিরে এসেছি।”
তবে স্থানীয়দের একাংশ মনে করছেন, এই পদক্ষেপ ইতিহাস ও জাতীয় সম্পদের প্রতি অবমাননাকর।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ
আইভি ভবনের নিচতলায় শিশুদের ক্লাসের ছবি প্রকাশ হওয়ার পর থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়। ব্যবহারকারীরা লিখেছেন,“যে বাড়িতে এক রাষ্ট্রপতি থাকতেন, সেখানে এখন শিশুদের বইয়ের ব্যাগ ও টিফিনবক্স—এটা ইতিহাসের অপমান।”
আরেকজন মন্তব্য করেন,“রাজনৈতিক পতনের পর ঐতিহ্যও যেন অবহেলায় হারিয়ে যাচ্ছে। পাপনের অনুপস্থিতিতেই সব এলোমেলো।” অন্যদিকে কেউ কেউ বলছেন, স্কুল চালু হওয়ায় অন্তত ভবনটি নষ্ট হওয়ার হাত থেকে বেঁচে গেছে।

স্থানীয় প্রতিক্রিয়া
কালিপ্রসাদ ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান ফয়জুল কবির বলেন,“এই বাড়িটি ভৈরবের গৌরবের প্রতীক। রাষ্ট্রীয়ভাবে সংরক্ষণ না থাকায় ভবনটি অরক্ষিত হয়ে পড়েছিল। এখন অন্তত সচল আছে, তবে ভবিষ্যতে একে স্মৃতিসৌধে রূপান্তর করা উচিত।”ভৈরবের ঠিকাদার ও আওয়ামী ঘরানার উদ্যোক্তা ও. আর. জুয়েল বলেন,“আইভি ভবন কোনো সাধারণ বাড়ি নয়। এটিকে স্কুলে পরিণত করা ইতিহাসের অবমাননা। যদি পরিবারের সদস্যরা সংরক্ষণে অক্ষম হন, তাহলে সরকারকে এগিয়ে আসা উচিত।”
পরিবারের নীরবতা ও অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ
জিল্লুর রহমানের বড় মেয়ে তানিয়া বাখতের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। অন্যদিকে নাজমুল হাসান পাপনের ঘনিষ্ঠজনরা জানাচ্ছেন, তিনি “রাজনৈতিক মামলা ও নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে আপাতত দেশে ফিরছেন না।”
তবে স্থানীয়দের প্রশ্ন -“যে পরিবার একসময় দেশের ক্ষমতার কেন্দ্র ছিল, তারা কি আজ নিজেদের ঐতিহ্যও ধরে রাখতে পারছেন না?”
শেষ কথা
একটি ঐতিহাসিক স্থাপনা, একটি রাজনৈতিক উত্তরাধিকার—এখন বিতর্ক ও সমালোচনার কেন্দ্রে। আইভি ভবনের বর্তমান রূপ ভৈরববাসীর মনে মিশ্র প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে।
কেউ বলছেন “ঐতিহ্য রক্ষার প্রয়াস”, আবার কেউ বলছেন “ঐতিহ্যের অবমাননা”।
কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায় –যদি রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর ইতিহাসই হারিয়ে যায়, তাহলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম কি আর জানবে—এই বাড়িই ছিল বাংলাদেশের এক রাষ্ট্রপতির শেকড়?











Leave a Reply