রণাঙ্গনে একজন মুক্তিযোদ্ধা
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানী সৈন্যদের বর্বর হত্যাকান্ড, নারী ধর্ষণ, অগ্নি সংযোগ ও মানবতা লঙ্গনকারী রক্ত পিপাষু হায়েনা পাক হানাদার বাহিনীকে বাংলাদেশের মাটি থেকে চিরতরে উৎখাতের জন্য ও বাংলাদেশকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসাবে প্রতিষ্ঠা করার সংকল্প নিয়ে ট্রেনিং শেষ করে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য আমাদের “মেঘনা রিভার অপারেশন ফোর্স” এর কোম্পানী কমান্ডার হিসাবে ভৈরব এর রসুলপুর গ্রামের হিন্দী ভাষায় পারদর্শী ও অসীম সাহসী ব্যাক্তি এম.এ হামিদকে ট্রেনিং সেন্টার হতে দায়িত্ব দেওয়া হয়।
১০৪ জন মুক্তিযোদ্ধা অস্ত্র-সস্ত্র ও গোলাবারুদসহ ট্রাক যোগে ভারত সীমান্তের ঢালু মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে অবস্থান করি। বাংলাদেশে প্রবেশের আগে ঢালু মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে অবস্থান কালে ভারতীয় বি.এস.এফ এর অধিনায়ক বাজেৎ সিং এর নির্দেশে আমরা বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী হালুয়াঘাট, নালীতাবাড়ির হাতিবাধা ও বারমারি চেয়ারম্যান টিলায় পাকহানাদার বাহিনীর ক্যাম্পে রাতের অন্ধকারে ঐ এলাকার কমান্ডার আব্দুল আলী বুতের সহযোগিতায় ভারতীয় বি.এস.এফ এর আর্টিলারি কভারীং ফায়ারে ভোর রাত্রে উক্ত পাকিস্তানী ক্যাম্পে ত্রিমুখী অতর্কিত (রেইড) হামলা করি। উক্ত যুদ্ধে একজন মেজর সহ ২০ জন পাকসেনাকে হত্যা করে সকালে আবারো ঢালু ক্যাম্পে ফিরে আসি এবং জানতে পারি ঐ দিনই বাকী পাকসেনাদেরকে হেলিকপ্টার যুগে ঢাকায় ফেরৎ নেয়। ফলে তৎএলাকা শত্রুমুক্ত হয়। পরদিন ভারতের ঢালু বি.এস.এফ ক্যাম্পের কর্ণেল কেডি রাজপুত চৌহান ও ক্যাপ্টেন বাজিৎ সিং ঢালুর একটি স্কুলের হল রুমে অনুষ্ঠানের মাধ্যমে আমাদের কোম্পানী কমান্ডার এম.এ হামিদকে ভারতীয় মুদ্রায় ১০০ টাকা পুরষ্কৃত করেন। পরবর্তীতে লংড়া ক্যাম্পে অবস্থান করে আমরা কমলাকান্দা থানার নাজিরপুরে পাকসেনাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধরত তারা মিয়া গ্রুপের ৫ জন শহিদ ও তারা মিয়ার গলায় গুলিবিদ্ধ হওয়ার খবর পেয়ে তাৎক্ষণিকভাবে ঐ বাহিনীর সাথে যোগাযোগ করে পাক বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হই। পাঁচজন শহিদ মুক্তিযোদ্ধাকে বাংলাদেশের মাটিতে কবর দেওয়া হয়। আমরা তাদের রক্তের শপথ নিয়ে আবারও পাকসেনাদের ওপর আক্রমন করি এবং উক্ত স্থান শত্রুমুক্ত করি।
ভারতের সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে বিভিন্ন রণাঙ্গনে যুদ্ধ করার সময় নিজ এলাকা ভৈরবকে মুক্ত করার স্বপ্ন দেখতাম। স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালীন আট হতে পনের বছরের ছেলে-মেয়েরা পাক বাহিনী, রাজাকার ও দালালদের গতিবিধি আমাদের কাছে পৌঁছে দিত, ফলে আমাদের অপারেশন করা অনেক সহজ হয়েছিল। এছাড়া এলাকার স্বাধীনতাকামী নারী-পুরুষ আমাদেরকে খাবার-দাবারসহ বিভিন্নভাবে সাহায্য সহযোগিতা করেছেন। তাই আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সাফল্যের জন্য প্রতিটি স্বাধীনতাকামী নারী-পুরুষ এই স্বাধীনতা সংগ্রামের সহযোদ্ধা ও বীরত্বের অংশীদার বলে মনে করি। “মেঘনা রিভার অপারেশন ফোর্স” এ ভারতীয় প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত সাথী অন্যান্য বীর মুক্তিযোদ্ধারা (লিখা অবস্থায় যাদের নাম স্মরণে আছে) হচ্ছেন- এম.এ হামিদ (কোম্পানী কমান্ডার), ইটনার সালাউদ্দিন (টুআইসি), শ্রীনগর গ্রামের নাজিম উদ্দিন, ইটনার আব্দুস ছাত্তার (প্লাটুন কমান্ডার), চাঁনপুর গ্রামের এ.কে.আর হাবিবুল বাহার (গ্রুপ কমান্ডার), মৌটুপী গ্রামের আমার চাচাতো ভাই হামিদুল হক, রসুলপুর গ্রামের এম.এ শহিদ (মৃত), সৈয়দ হাবিবুর রহমান, জয়নাল আবেদীন (মৃত), মাইন উদ্দিন মাষ্টার, মহি উদ্দিন, শাজাহান কবির, খালেকুজ্জামান, ফিরোজুর রহমান (মৃত), শ্রীনগর গ্রামের আলাল উদ্দিন, আব্দুল মতিন, জালাল উদ্দিন (মৃত), চন্ডিবের গ্রামের আঃ রহমান রতন (মৃত), কালিকাপ্রসাদ গ্রামের কামাল উদ্দিন, রহমত উল্লাহ, আলী আজগর, বাচ্চু মিয়া, সিরাজ মিয়া, কালিকাপুরের আব্দুল করিম ও শাহাবুদ্দিন (মৃত), জগমোহনপুরের রহমত উল্লাহ, রাজাকাটা গ্রামের ইসলাম উদ্দিন, কিশোরগঞ্জ সদরের আনোয়ার কামাল, শহিদুল হক, আব্দুল কাদির, কটিয়াদীর আব্দুল জব্বার, বাজিতপুরের খুর্শেদ আলম (মৃত), কুলিয়ারচর ভরাডুল গ্রামের গিয়াস উদ্দিন, কুলিয়ারচর ফরিদপুরের এমদাদুল হক, ছয়সূতি নোয়াগাও এর আব্দুল গফুর (মৃত), ইটনার মামুন, মোঃ ইদ্রিছ ভাই, চট্রগ্রামের অধিবাসী বাবু সমির চন্দ্র ও নোয়াখালীর আব্দুল জলিল সহ কুলিয়ারচর, নিকলী, অষ্টগ্রাম, ইটনা ও আজমীরির আরো অনেকে। মুক্তিযুদ্ধে আমরা ভৈরবে অবস্থান করার সময়ে ভারতে প্রশিক্ষণ না দিয়েও অসীম সাহসিকতার সহিত বিভিন্ন অপারেশন সহ সার্বক্ষণিক বিভিন্ন ক্যাম্পে আমাদের সাথে থেকে মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন যথাক্রমে বাঁশগাড়ী গ্রামের ইলিয়াছ মেম্বার (মৃত) ও লাল মিয়া (মৃত), গজারিয়া গ্রামের কালি দাস বাবু (মৃত)ও তারই ভাই চেতু বাবু, চন্ডিবের গ্রামের খান বাড়ির মোঃ সেলিম খান, কালিকাপ্রসাদ আদর্শ পাড়ার মোঃ গিয়াস উদ্দিন (মৃত) ও কালিকাপ্রসাদ গ্রামের আনসার বাহিনীর সদস্য মোঃ বাচ্চু মিয়া (মৃত)। মহান মুক্তিযুদ্ধের সময়কালে এমন কিছু উল্লেখ যোগ্য ঘটনা যাহা অবতারনা না করলে স্মৃতিচারণে অসামাপ্ত থেকে যাবে। বিশেষ করে নাসিরনগর, সরাইল, কুলিয়ারচর ও ভৈরবের গুলিবিদ্ধ আহত মুক্তিযোদ্ধা ও সাধারণ জনতাকে তৎকালীন সময়ে ভৈরবের স্বনামধন্য মৌটুপী গ্রামের ডাক্তার হেলাল উদ্দিন হোসাইন ও ডাক্তার আব্দুস সামাদ মৌটুপী গ্রামের নিজ বাড়ীতে চিকিৎসা সেবা দিয়েছেন।
ডাক্তার হেলাল উদ্দিন হোসাইন এর বড় ছেলে মোঃ জাহাঙ্গীর হোসাইন বাদল (বর্তমানে বিচারপতি হাইকোর্ট ডিভিশন) তার বাবার চিকিৎসা দেওয়ার কাজে সার্বক্ষণিক সহযোগিতা করেছেন। ডাক্তার আব্দুস সামাদ এর সহিত তার ছোট ভাই আব্দুস সালাম ও ভাগিনা ডাক্তার হাবিবুর রহমান সহযোগিতা করেছেন। আটচল্লিশ বছর পর মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে আজ অনেক ঘটনার অবতারণ করতে পারিনি। চলবে…….
লেখক :
বীর মুক্তিযোদ্ধা হাজি মোঃ তোফাজ্জল হক
আহবায়ক ভৈরব উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড, সাবেক চেয়ারম্যান, সাদেকপুর ইউনিয়ন পরিষদ ভৈরব, কিশোরগঞ্জ।
মোবাইল: ০১৭১১-৪৮৯০৬৭








