নাজির আহমেদ আল-আমিন
কিশোরগঞ্জের ভৈরব উপজেলায় একই সময়ে দু’জন গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক কর্মকর্তার বদলীকে ঘিরে জনমতে স্পষ্ট বৈপরীত্য দেখা দিয়েছে। একদিকে ভৈরব থানার ওসি খন্দকার ফুয়াদ রুহানীর বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের অসন্তোষ ও অভিযোগের কথা এলাকাবাসী তুলে ধরছেন; অন্যদিকে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শবনম শারমিনের বিদায়ে মানুষের মধ্যে দুঃখ, ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতার স্রোত বইছে। দু’জনই বদলী হওয়ায় এখন এলাকাবাসী অতীত অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে ভিন্নধর্মী প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছেন।
ভৈরব থানার ওসি খন্দকার ফুয়াদ রুহানীর দায়িত্বকালজুড়ে সাধারণ মানুষের অভিযোগের অন্ত ছিল না। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী- থানায় গিয়ে ওসির সাথে দেখা করা বা কথা বলা কঠিন ছিল। অভিযোগ দিতে গেলে হয়রানির শিকার হতে হতো, তাঁর আচরণে অহংকার ও রুক্ষতার ছাপ পাওয়া যেত, সাধারণ মানুষের ছোট সমস্যাগুলোকেও গুরুত্ব দেওয়া হতো না, থানার পরিবেশ হয়ে ওঠে অস্বস্তিকর ও জনবিচ্ছিন্ন
অভিযোগ রয়েছে, বাজার, ব্যবসায়ী সংগঠন বা সামাজিক অনুষ্ঠানে ওসির উপস্থিতি খুব কমই দেখা যেত। ফলে সাধারণ মানুষের সঙ্গে দূরত্ব আরও বেড়েছিল।
সাংবাদিক সমাজও ওসির বদলীতে স্বস্তি প্রকাশ করেছেন। তাদের অভিযোগ- তথ্য নিতে গেলে অসহযোগিতা, ফোনে রুক্ষ বা আপত্তিকর ভাষা“, সময় নেই”, “যা খুশি লিখেন”-এমন নেতিবাচক মন্তব্য, সাংবাদিক পরিচয় দিয়েও সম্মান না পাওয়া, প্রয়োজনীয় তথ্য গোপন বা এড়িয়ে যাওয়া।
অনেক বাসিন্দা অভিযোগ করেন- রাতে ছিনতাই বেড়ে যাওয়ার পরও পুলিশি টহল চোখে পড়ত না। অভিযোগ করলেও তা গুরুত্ব দিয়ে দেখা হতো না।
একজন ক্ষুব্ধ স্থানীয় বলেন, ওসি জনগণের নয়, নিজের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিলেন। তাই মানুষ নিরাপত্তাহীনতায় ভুগত।
ওসির বিরুদ্ধে এসব অভিযোগের বিষয়ে তাঁর কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
ঠিক বিপরীত চিত্র দেখা গেছে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শবনম শারমিনের বিদায় উপলক্ষে। দায়িত্ব পালনকালে তিনি জনপ্রশাসনের এক উজ্জ্বল উদাহরণ হিসেবে ভৈরবের মানুষের মনে গভীর দাগ কেটে গেছেন।
দায়িত্বকালজুড়ে তিনি- প্রতিদিন দরিদ্র, অসহায় ও ভুক্তভোগীদের কথা শুনতেন। আগুন লাগা, জমি দখল, পারিবারিক বিরোধ-যে কোনো ঘটনায় দ্রুত ছুটে যেতেন। নারী, শিশু ও শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ উদ্যোগ নিতেন।প্রভাবশালীর চাপকে উপেক্ষা করে ন্যায়বিচারে কাজ করতেন, অফিসকে সাধারণ মানুষের জন্য সর্বদা উন্মুক্ত রাখতেন।
সাংবাদিকরা জানান- তিনি সর্বদা সম্মান দেখাতেন, প্রয়োজনীয় তথ্য দিতে দেরি করতেন না, উন্নয়নমূলক কাজের ক্ষেত্রে সংবাদমাধ্যমকে সহযোগী ভাবতেন, কোনো অন্যায় আড়াল করতে চেষ্টা করতেন না।
বদলীর খবরে স্থানীয় মানুষ ও প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে একাধিক বিদায় অনুষ্ঠান আয়োজন হয়। বক্তারা তাঁকে-সৎ, নির্ভীক, মানবিক, দক্ষ প্রশাসক হিসেবে মূল্যায়ন করেন।
অনেকেই বলেন, ভৈরব অনেক বছর পর এমন একজন মানুষের ইউএনও পেয়েছিল। তাঁর বিদায়ে আমরা শূন্য হয়ে গেলাম। অনুষ্ঠানস্থলে বহু মানুষ কান্নায় ভেঙে পড়েন।
দুই বদলীতে জনমতের দুই রঙ
ওসি খন্দকার ফুয়াদ রুহানীর বদলীতে সাধারণ মানুষের মধ্যে স্বস্তির অনুভূতি, অন্যদিকে ইউএনও শবনম শারমিনের বিদায়ে গভীর শূন্যতা ও আবেগঘন প্রতিক্রিয়া।
ভৈরবের মানুষ বলছেন- প্রশাসনে কঠোরতা দরকার, কিন্তু তার চেয়েও বেশি দরকার মানবিকতা, দায়িত্ববোধ ও জনসম্পৃক্ততা।






