সিজারের সময় জরায়ু কেটে ফেলার অভিযোগ: থানার সামনে দুই ঘণ্টা মরদেহ, প্রশাসনের উপস্থিতিতেই ৪ লাখ টাকায় আপোষ
নাজির আহমেদ আল-আমিন
কিশোরগঞ্জের ভৈরবে একটি বেসরকারি হাসপাতালে সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের সময় চরম চিকিৎসা অবহেলার অভিযোগে এক প্রসূতির মৃত্যুর ঘটনায় গুরুতর প্রশ্নের মুখে পড়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয় প্রশাসন। নিহত প্রসূতির নাম ঝুমা বেগম (২০)। তিনি কালীপুর এলাকার মো. কুদ্দুস মিয়ার মেয়ে এবং কালিকাপ্রসাদ এলাকার মো. তৌফিক মিয়ার স্ত্রী।
পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, মাত্র দেড় বছর আগে বিয়ে হওয়া ঝুমার এটিই ছিল প্রথম সন্তান। গত বৃহস্পতিবার (১ জানুয়ারি) বিকেলে প্রসব বেদনা শুরু হলে তাকে ভৈরব ট্রমা ও জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়াই রাত আনুমানিক ৮টার দিকে ডা. হরিপদ দেবনাথ তড়িঘড়ি করে সিজারিয়ান অপারেশন করেন।
অপারেশনের সময় একটি সুস্থ পুত্রসন্তানের জন্ম হলেও কিছুক্ষণের মধ্যেই ঝুমার শারীরিক অবস্থার অবনতি শুরু হয়। স্বজনদের অভিযোগ, অস্ত্রোপচারের সময় চিকিৎসকের ভুলে রোগীর জরায়ু কেটে ফেলা হয়। এতে শুরু হয় ভয়াবহ অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণ।

স্বজনরা জানান, রাতভর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের নির্দেশে অন্তত ৮ ব্যাগ রক্ত দেওয়া হয়। তবুও রোগীর অবস্থার কোনো উন্নতি হয়নি। শুক্রবার (২ জানুয়ারি) সকালে অবস্থার অবনতি ঘটলে ডা. হরিপদ দেবনাথ ঝুমাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার করেন। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শনিবার (৩ জানুয়ারি) ভোরে তার মৃত্যু হয়।
নিহতের চাচা দেলোয়ার হোসেন বলেন, ডাক্তারের ভুল চিকিৎসার কারণেই আমার ভাতিজির মৃত্যু হয়েছে। সময়মতো সঠিক সিদ্ধান্ত নিলে হয়তো আজ সে বেঁচে থাকত।
চাচাতো ভাই রাকিব বলেন, এটা কোনো স্বাভাবিক মৃত্যু নয়। এটি সরাসরি অবহেলা। দায় এড়ানোর জন্যই শেষ মুহূর্তে ঢাকায় পাঠানো হয়েছে।
ঝুমার মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার পর স্বজনরা মরদেহ নিয়ে ভৈরব থানায় গিয়ে হাসপাতালের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দিতে চান। তবে অভিযোগ রয়েছে, তাৎক্ষণিকভাবে মামলা গ্রহণ করা হয়নি। একপর্যায়ে নিহতের স্বজনরা থানার গেইটের সামনে প্রায় দুই ঘণ্টা মরদেহ রেখে বিচার দাবি করেন। এ সময় সেখানে উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, পরিস্থিতি সামাল দিতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের প্রতিনিধিরা থানায় উপস্থিত হন। পরে তদন্তকারী কর্মকর্তা (ওসি তদন্ত) আবু তালেবের কক্ষে বসে নিহতের পরিবার ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের মধ্যে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
অভিযোগ রয়েছে, প্রশাসনের উপস্থিতিতেই চার লাখ টাকার বিনিময়ে অভিযোগ নিষ্পত্তি বা রফাদফা করা হয়। এর পর মরদেহ ময়নাতদন্ত ছাড়াই পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
নিহতের এক স্বজন বলেন, আমরা বিচার চেয়েছিলাম। কিন্তু মামলা নিতে দেরি করা হয়েছে। পরে আপোষের দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। আমাদের আর কিছু করার ছিল না।
এ বিষয়ে অভিযুক্ত চিকিৎসক ডা. হরিপদ দেবনাথের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তা বন্ধ পাওয়া যায়। আর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সাথেও যোগাযোগ করা হলে তারা কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা দিতে পারেনি এবং ক্যামেরার সামনে কথা বলতে রাজি হয়নি।

ভৈরব থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আতাউর রহমান আকন্দ বলেন, আমি ওইদিন কিশোরগঞ্জে মাসিক মিটিংয়ে ছিলাম। থানার ভেতরে কী হয়েছে, সে বিষয়ে তদন্ত ওসি জানেন। তবে শুনেছি, নিহতের পরিবার হাসপাতালের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নেই মর্মে একটি লিখিত দিয়েছে। এছাড়া তিনি বলেন হাসপাতালে যাতে করে কোন ঘটনা না ঘটে সেক্ষেত্রে পুলিশ সদস্য দেওয়া হয়েছিলো।
তবে এ বিষয়ে ওসি (তদন্ত) আবু তালেব বক্তব্য দিতে অনিচ্ছা প্রকাশ করেন।
এদিকে সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের অভিযোগ, এটি ছিল স্পষ্ট চিকিৎসা অবহেলার ঘটনা। অথচ কোনো মামলা, ময়নাতদন্ত বা স্বাধীন তদন্ত কমিটি ছাড়াই বিষয়টি আর্থিক সমঝোতার মাধ্যমে চাপা দেওয়া হয়েছে। তাদের মতে, থানার ভেতরে বসে আপোষের মাধ্যমে এমন গুরুতর অভিযোগ নিষ্পত্তি করা শুধু হাসপাতালের দায়িত্বহীনতাই নয়, প্রশাসনিক জবাবদিহিকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে।
ঘটনাটি এলাকায় তীব্র ক্ষোভ ও উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। সচেতন মহলের মতে, চিকিৎসা অবহেলায় মৃত্যুর মতো ঘটনায় আপোষ নয়, প্রয়োজন স্বাধীন তদন্ত, দায়ীদের বিরুদ্ধে মামলা এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি। অন্যথায় এ ধরনের মৃত্যুর দায় এড়ানোর সংস্কৃতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করবে।
দৃশ্যপট নিউজ / nazir ahammad






