ভৈরবে ৪ কোটি টাকার বেরিবাঁধ ও সড়ক কাজের অনিয়মের অভিযোগ
নাজির আহমেদ আল-আমিন
কিশোরগঞ্জের ভৈরব উপজেলার আগানগর ইউনিয়নের ছাগাইয়া গ্রামে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) অধীনে নির্মাণাধীন একটি বেরিবাঁধ সড়ক প্রকল্প নিয়ে চরম ক্ষোভ ও উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। সড়ক নির্মাণের জন্য স্থানীয় কৃষকদের ব্যক্তিগত ফসলি জমি থেকে ব্যাপকভাবে মাটি কেটে নেওয়া হলেও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সেই জমির গর্ত ভরাট না করায় বিঘার পর বিঘা জমি এখন চাষাবাদের অযোগ্য হয়ে পড়েছে। উন্নয়নের নামে কৃষকদের জীবিকা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় এলাকাজুড়ে অসন্তোষ বাড়ছে।
তথ্য অনুসন্ধানে জানা যায়, ছাগাইয়া কাচারিঘাট থেকে ছাগাইয়া সাউথ ইন্ড পর্যন্ত প্রায় এক কিলোমিটার বেরিবাঁধ সড়ক পাকা ও প্রশস্তকরণের জন্য ৪ কোটি ২৪ লাখ ৩৫ হাজার ৬৩৩ টাকা ব্যয়ে এলজিইডির একটি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। টেন্ডারের মাধ্যমে কাজটি পায় চট্টগ্রামের নাসিরাবাদের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মোহাম্মদ ইউনুস এন্ড ব্রাদার্স (প্রা.) লিমিটেড। তবে বাস্তবে সড়ক নির্মাণের কাজটি পরিচালনা করছে স্থানীয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স মমিনুল হক এন্টারপ্রাইজ, যা প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা ও তদারকি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।

চলতি বছরের ২২ মার্চ প্রকল্পের কাজের উদ্বোধন করা হয়। প্রথম তিন মাসে সড়ক উঁচু করার জন্য মাটি ভরাট ও কিছু অংশে ব্লক বসানোর কাজ করা হলেও বর্ষা মৌসুম শুরু হলে হঠাৎ করেই কাজ বন্ধ হয়ে যায়। এ সময় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান প্রকল্পের মোট বিলের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ অর্থ উত্তোলন করে নেয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র নিশ্চিত করেছে। দীর্ঘ সময় কাজ বন্ধ থাকায় সড়ক ও আশপাশের কৃষিজমি দুটিই ক্ষতির মুখে পড়েছে।
কৃষকরা জানান, কাজ শুরুর আগে ঠিকাদার ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা তাদের আশ্বস্ত করেছিলেন যে সড়ক নির্মাণ শেষে বাইরে থেকে মাটি এনে জমির গর্তগুলো ভরাট করে দেওয়া হবে। সেই আশ্বাসে তারা ফসলি জমি থেকে মাটি কাটার অনুমতি দেন। কিন্তু বর্ষা মৌসুম শেষ হলেও সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন হয়নি। জমিগুলোতে বড় বড় গর্ত তৈরি হয়ে পানি জমে স্থায়ী জলাশয়ের মতো অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে, যার ফলে চলতি ও আসন্ন মৌসুমে চাষাবাদ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
একই সঙ্গে সড়ক নির্মাণের কাজের মান নিয়েও গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, রাস্তার বিভিন্ন অংশে বসানো ব্লক কাজ শেষ হওয়ার আগেই ভেঙে যাচ্ছে এবং নিম্নমানের জিও টেক্সটাইল ব্যবহার করা হয়েছে। এতে সড়কের স্থায়িত্ব নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করছেন এলাকাবাসী।

ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক মিষ্টু মিয়া বলেন, আমাদের ভৈরবের ঠিকাদাররা আশ্বাস দিয়েছিল বর্ষার আগেই জমি সমান করে দেবে, কিন্তু এক বর্ষা চলে গেলেও কোনো কাজ হয়নি, ফলে তিনি জমিতে ফসল ফলাতে পারছেন না। কৃষক হযরত আলী অভিযোগ করেন, জমির গর্তে পানি জমে স্থায়ী জলাশয়ে পরিণত হওয়ায় আগামী কয়েক বছরেও সেখানে ফসল উৎপাদন সম্ভব হবে না। আরেক কৃষক মো. দুলাল মিয়া বলেন, তাদের ফসলি জমি এখন খাদের মতো হয়ে গেছে, তাই জমি ভরাটের পাশাপাশি সড়ক নির্মাণ কাজ দ্রুত শেষ করার দাবি জানান তারা।
এছাড়া স্থানীয় লোকজন বলছেন, শুধু কৃষকের জমির ক্ষতি হয়নি ! রাস্তার কাজ,ব্লকের কাজ ,বালু ফেলার কাজ ও বেরিবাধের কাজেও অনিয়ম হয়েছে । যা দেখার কেউ নেই।
জমির গর্ত ভরাটের বিষয়ে জানতে চাইলে স্থানীয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স মমিনুল হকের প্রতিনিধিরা সরাসরি কথা বলতে রাজি হননি। তবে তাদের এক প্রতিনিধি মতিউর রহমান দাবি করেন, গত বর্ষাকালে কিছু অংশে মাটি ভরাট করা হয়েছে এবং আগামী মৌসুমে বাকি গর্তগুলো ভরাট করা হবে।

এ বিষয়ে উপজেলা প্রকৌশলী ইসতিয়াক আহমেদ বলেন, কৃষকের জমি ক্ষতিগ্রস্ত করে উন্নয়ন কাজ করার কোনো বিধান নেই। বিষয়টি কর্তৃপক্ষের নজরে এসেছে এবং ঠিকাদারকে দ্রুত গর্ত ভরাটের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তিনি জানান, কাজের মেয়াদ এক বছর এবং আগামী বছরের জুন মাসের মধ্যে কাজ শেষ করতে হবে। ইতোমধ্যে ঠিকাদার প্রায় দেড় কোটি টাকা বিল উত্তোলন করেছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। অবহেলা করলে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিল আটকে দেওয়া এবং আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও সতর্ক করেন তিনি।
এদিকে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স মমিনুল হক এন্টারপ্রাইজ এর স্বত্বাধিকারী মমিনুল হক সেলিম বলেন, প্রকল্পটি মূলত চট্টগ্রামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের এবং তার প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কাজটি হয়েছে। বর্তমানে অন্যরা এ কাজের তদারকি করছে এবং তিনি এখন আর সরাসরি এই প্রকল্পের সঙ্গে জড়িত নন।
সবকিছু মিলিয়ে স্থানীয়দের প্রশ্ন-কৃষকের ফসলি জমি থেকে মাটি নেওয়ার অনুমোদন কে দিল, কাগজে এক ঠিকাদার আর মাঠে আরেক ঠিকাদারের এই বাস্তবতা কতটা বৈধ, আর বিল উত্তোলনের পর দীর্ঘদিন কাজ বন্ধ থাকলেও কেন কার্যকর তদারকি হয়নি-এই প্রশ্নগুলোর স্পষ্ট জবাব এখনো পাওয়া যায়নি।
দৃশ্যপট নিউজ/N.A






