বিশেষ প্রতিবেদক
ভোরের আলো ফোটার আগেই কিশোরগঞ্জের নরসুন্দা নদীর তীরে ব্যস্ততা শুরু হয়। কঠোর নিরাপত্তা বেষ্টনীর মধ্যে একে একে খোলা হয় পাগলা মসজিদের লোহার দানবাক্সগুলো। প্রতিটি সিন্দুক খুলতেই বেরিয়ে আসে মানুষের বিশ্বাস, মানত আর নিঃস্বার্থ দানের গল্প। গণনা শেষে যে অঙ্ক সামনে আসে, তা আবারও তাক লাগিয়েছে দেশবাসীকে ১১ কোটি ৭৮ লাখ ৪৮ হাজার ৫৩৮ টাকা।
দীর্ঘ ৩ মাস ২৭ দিন পর শনিবার (২৭ ডিসেম্বর) সকাল ৭টায় পাগলা মসজিদের ১৩টি দানবাক্স খোলা হয়। সারাদিন ধরে চলে টাকা গণনার কাজ। সন্ধ্যা ৭টায় রূপালী ব্যাংক কিশোরগঞ্জ শাখার ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার রফিকুল ইসলাম নিশ্চিত করেন চূড়ান্ত হিসাব। এবারও দানবাক্সে পাওয়া গেছে শুধু দেশীয় টাকা নয় বৈদেশিক মুদ্রা ও স্বর্ণালংকার।
দানবাক্স খোলার সময় উপস্থিত ছিলেন কিশোরগঞ্জের জেলা প্রশাসক ও পাগলা মসজিদ পরিচালনা কমিটির সভাপতি মোহাম্মদ আসলাম মোল্লা, পুলিশ সুপার ড. এস এম ফরহাদ হোসেন, অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ও দানবাক্স খোলা কমিটির আহ্বায়ক মো. এরশাদুল আহমেদ, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব)মোহাম্মদ নাহিদ হাসান খান। সেনাবাহিনী, র্যাব, পুলিশ ও আনসার সদস্যদের সমন্বয়ে নেওয়া হয় সর্বোচ্চ নিরাপত্তা ব্যবস্থা।
মসজিদ পরিচালনা কমিটির সভাপতি ও জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আসলাম মোল্লা জানান, পাগলা মসজিদের দানের অর্থ মসজিদের নামে খোলা ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা রাখা হয়। তিনি বলেন, পাগলা মসজিদের টাকা নয়ছয় করার কোনো সুযোগ নেই। প্রতিটি টাকার হিসাব অত্যন্ত স্বচ্ছভাবে রাখা হয়।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় ১২০ কোটি টাকা ব্যয়ে বহুতল মসজিদ কমপ্লেক্স নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যা বাস্তবায়িত হলে এটি দেশের অন্যতম বৃহৎ ধর্মীয় স্থাপনায় রূপ নেবে।
লোককথা বলে, একসময় নরসুন্দা নদীর বুকে জেগে ওঠা এক চরে বাস করতেন এক আধ্যাত্মিক পাগল সাধক। তার মৃত্যুর পর সেই স্থানে নির্মিত মসজিদটিই পরিচিতি পায় ‘পাগলা মসজিদ’ নামে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই মসজিদ ঘিরে গড়ে ওঠে এক অদ্ভুত বিশ্বাস এখানে মানত করলে মনের আশা পূরণ হয়।
এই বিশ্বাসই আজ পাগলা মসজিদকে পরিণত করেছে দেশের সবচেয়ে বেশি দানপ্রাপ্ত মসজিদগুলোর একটিতে। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মানুষ এখানে দান করেন কেউ টাকা, কেউ গয়না, কেউবা জীবনের শেষ সম্বলটুকু।
প্রতি শুক্রবার পাগলা মসজিদ প্রাঙ্গণে নামে হাজার হাজার মানুষের ঢল। কেউ নামাজ পড়তে, কেউ মানত করতে, কেউবা শুধু দোয়া চাইতে। নরসুন্দা নদীর তীরে দাঁড়িয়ে থাকা এই মসজিদ যেন কেবল ইট-পাথরের স্থাপনা নয় এটি হয়ে উঠেছে মানুষের আশা ও বিশ্বাসের প্রতীক।
জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে পাগলা মসজিদের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা রয়েছে ১০৪ কোটি টাকা এবং অনলাইনে জমা হয়েছে ১২ লাখ ৮৯ হাজার ৯৪৩ টাকা।
বিশ্বাস আর দানের এই ধারাবাহিকতা প্রমাণ করে পাগলা মসজিদ কেবল একটি উপাসনালয় নয়, এটি এ দেশের মানুষের আস্থা, আবেগ ও ইতিহাসের এক জীবন্ত সাক্ষ্য।
দৃশ্যপট নিউজ /nazir ahammad








