জাপানের ইতিহাসে নতুন অধ্যায়: প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাকাইচি
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
দীর্ঘদিন পুরুষ-প্রধান রাজনীতির ইতিহাসে নতুন অধ্যায় রচনা করলেন সানায়ে তাকাইচি।
জাপানের শাসক দল লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) এই নেত্রী মঙ্গলবার (২১ অক্টোবর) অনুষ্ঠিত পার্লামেন্টের ভোটাভুটিতে নিম্নকক্ষে ২৩৭ ও উচ্চকক্ষে ১২৫ ভোট পেয়ে দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হয়েছেন।
মাত্র পাঁচ বছরের মধ্যে এটি জাপানের পঞ্চম নেতৃত্ব পরিবর্তন, যা দেশটির রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার অভাবও তুলে ধরে। ৬৪ বছর বয়সী তাকাইচি দায়িত্ব নেওয়ার পরই সামনে পাচ্ছেন একাধিক চ্যালেঞ্জ—বিশেষ করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আগামি সফর, প্রতিরক্ষা ব্যয়, এবং বাণিজ্য সম্পর্কিত জটিল আলোচনাগুলো তার প্রথম পরীক্ষার ক্ষেত্র হতে যাচ্ছে।
রাজনীতির আগে ছিলেন ব্যান্ডের ড্রামার
রাজনীতিতে আসার আগে তাকাইচি ছিলেন এক হেভি মেটাল ব্যান্ডের ড্রামার। পরবর্তীতে নিজের দৃঢ় নেতৃত্ব, সাহসী সিদ্ধান্ত ও নীতিগত অবস্থানের জন্য তিনি এলডিপির অন্যতম প্রভাবশালী মুখ হয়ে ওঠেন।
দলের জনপ্রিয়তা কমে যাওয়ার পর, জোটসঙ্গী কোমেইতো পার্টি অর্থ কেলেঙ্কারির ঘটনায় এলডিপি ছেড়ে দিলে তাকাইচি দ্রুত নতুন কৌশল নেন। তিনি জাপান ইনোভেশন পার্টি (জেআইপি)-এর সঙ্গে নতুন জোট গঠন করেন, যা সোমবার রাতে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষরিত হয়।
এই নতুন জোট করপোরেট অনুদান বাতিল, সংসদ সদস্য সংখ্যা কমানো এবং খাদ্যে ভ্যাট শূন্যে নামানোর পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। তাকাইচি প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, জাপানের অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করতে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য টেকসই উন্নয়নের ভিত্তি গড়ে তুলব।”
নারী নেতৃত্বের পথে জাপান
জাপানে নারী নেতৃত্বের অভাব বহুদিনের। বর্তমানে মন্ত্রিসভায় নারী সদস্য মাত্র দুইজন। তাকাইচি জানিয়েছেন, তিনি নর্ডিক দেশগুলোর আদলে একটি নারী নেতৃত্বসমৃদ্ধ মন্ত্রিসভা গঠন করতে চান।
স্থানীয় সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, নতুন মন্ত্রিসভায় ডানপন্থি রাজনীতিক সাতসুকি কাতায়ামা অর্থমন্ত্রী এবং অর্ধেক আমেরিকান বংশোদ্ভূত কিমি ওনোদা অর্থনৈতিক নিরাপত্তা মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পেতে পারেন।
বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের গ্লোবাল জেন্ডার গ্যাপ রিপোর্ট ২০২৫ অনুযায়ী, ১৪৮ দেশের মধ্যে জাপানের অবস্থান ১১৮তম। নিম্নকক্ষে নারীর উপস্থিতি মাত্র ১৫ শতাংশ—যা উন্নত দেশগুলোর তুলনায় অনেক কম।
তাকাইচি বলেন, নারীদের স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানো আমার অগ্রাধিকার। বিশেষ করে মেনোপজ ও প্রজনন স্বাস্থ্য বিষয়ে খোলামেলা আলোচনার সময় এসেছে। তবে তিনি এখনো স্বামী–স্ত্রীর একক পদবি বাধ্যতামূলক রাখা এবং রাজপরিবারে নারী উত্তরাধিকার নিষিদ্ধ করার আইন পরিবর্তনের বিষয়ে সতর্ক অবস্থানে আছেন।
জনগণের প্রত্যাশা ও প্রতিক্রিয়া
তার নিজ শহর নারার ৭৬ বছর বয়সী তোরু তাকাহাশি বলেন, তাকাইচি শক্ত মানসিকতার মানুষ। তিনি ট্রাম্পের মতো আগ্রাসী নন, কিন্তু সিদ্ধান্তে তিনি কখনো দ্বিধা করেন না।”
নারার কর্মজীবী নারী কেইকো ইয়োশিদা আশা প্রকাশ করেন,“আমি চাই তিনি এমন এক জাপান গড়ে তুলুন, যেখানে নারীরা নিরাপদ ও সম্মানজনকভাবে বাঁচতে পারেন।”
আর ১৮ বছর বয়সী শিক্ষার্থী নিনা তেরাও বলেন, যদি তিনি শিশুসেবা ও মাতৃত্বকালীন সুবিধা বাড়ান, তাহলে তা হবে জাপানের জন্য যুগান্তকারী পরিবর্তন।”
আন্তর্জাতিক সম্পর্কের সামনে চ্যালেঞ্জ
ওয়াশিংটন ও টোকিওর নতুন বাণিজ্য চুক্তির বিষয়গুলো এখনো চূড়ান্ত হয়নি। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প জাপানকে রাশিয়া থেকে জ্বালানি আমদানি বন্ধ করতে এবং প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়াতে চাপ দিচ্ছেন।
নারার এক প্রবীণ বাসিন্দা সাতোশি সাকামতো মন্তব্য করেন, “আমি চাই তাকাইচি এমন এক প্রধানমন্ত্রী হোন, যিনি প্রয়োজনে সাহসের সঙ্গে ‘না’ বলতে পারেন।”
নতুন সূচনার দোরগোড়ায় জাপান
তাকাইচির নেতৃত্বে জাপান এখন প্রবেশ করছে এক নতুন যুগে—যেখানে প্রথমবারের মতো একজন নারী দেশের সর্বোচ্চ রাজনৈতিক আসনে বসছেন। পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি, দৃঢ় নেতৃত্ব এবং নারী ক্ষমতায়নের নতুন আশায় তাকিয়ে আছে পুরো জাতি।










Leave a Reply