নাজির আহমেদ আল-আমিন
ধ্বংসস্তূপ, ভাঙা ঘরবাড়ি, ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা আসবাবপত্র প্রথম দেখায় মনে হতে পারে এটি কোনো যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ। কিন্তু বাস্তবে এটি কিশোরগঞ্জের ভৈরব উপজেলার আগানগর ইউনিয়নের লুন্দিয়া গ্রাম, যেখানে একটি হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে নেমে এসেছে ভয়াবহ তাণ্ডব।
গেল ২৩ মার্চ রাত সাড়ে ৯টার দিকে পূর্ব শত্রুতার জেরে ইমান হোসেন (২০) নামে এক যুবককে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। নিহত ইমান পাগলাহাটী গ্রামের ইসাক মিয়ার ছেলে। পরিবারের দাবি, বাবার মোবাইল ফোনের জন্য মিনিট কার্ড কিনতে বাড়ি থেকে বের হলে আগে থেকেই ওঁত পেতে থাকা প্রতিপক্ষ শেখ বাড়ির ১০-১৫ জন যুবক তার পথরোধ করে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে গুরুতর আহত করে। পরে তাকে উদ্ধার করে ভৈরব উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।

এ ঘটনার পরপরই পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। অভিযোগ রয়েছে, প্রতিশোধের জেরে প্রতিপক্ষের লোকজন শেখ বাড়িতে হামলা চালিয়ে পাকা, আধাপাকা ও টিনশেড মিলিয়ে শতাধিক ঘরবাড়ি ভাঙচুর করে। হামলাকারীরা ঘরের ভেতরে থাকা নগদ টাকা, স্বর্ণালঙ্কার ও আসবাবপত্র লুট করে নিয়ে যায়। ক্ষতিগ্রস্তদের দাবি, লুট হওয়া মালামালের পরিমাণ প্রায় কোটি টাকার কাছাকাছি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, হত্যাকাণ্ডের পর শেখ বাড়ির পুরুষ সদস্যরা গ্রেফতার এড়াতে এলাকা ছেড়ে চলে গেলে রাতের আঁধারে একদল যুবক বাড়িতে ঢুকে নারীদের ভয়ভীতি প্রদর্শন ও মানসিক নির্যাতন চালায়। এতে পুরো এলাকায় আতঙ্ক বিরাজ করছে এবং অনেক পরিবার এলাকা ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক শেখ বাড়ির এক নারী বলেন, রাতে আমরা খুব ভয় পাই। পুরুষ মানুষ না থাকায় আমরা অসহায় হয়ে পড়েছি। প্রশাসন যদি দ্রুত ব্যবস্থা না নেয়, তাহলে আমাদের পক্ষে এখানে থাকা কঠিন হয়ে যাবে।
স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল কাদির বলেন, এভাবে একটা হত্যাকাণ্ড থেকে পুরো গ্রাম ধ্বংস হয়ে যাবে, এটা কেউ ভাবেনি। এখন সাধারণ মানুষই সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছে।

আরেক বাসিন্দা রহিম উদ্দিন জানান, বাইরের লোকজনও সুযোগ নিয়ে লুটপাটে জড়িয়েছে। যারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তারা একেবারে নিঃস্ব হয়ে গেছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, লুন্দিয়া গ্রামের পাগলাহাটী ও শেখ বাড়ির মধ্যে গত ৭-৮ বছর ধরে আধিপত্য বিস্তার নিয়ে বিরোধ চলে আসছে। এর আগেও একাধিকবার সংঘর্ষ, ভাঙচুর ও আহত নিহতের হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। সর্বশেষ এই হত্যাকাণ্ড সেই দীর্ঘদিনের বিরোধকে আরও উসকে দিয়েছে।

নিহতের বাবা ইসাক মিয়া বলেন, ছেলে ভাত খেতে চাইছিল। আমি তাকে মিনিট কার্ড আনতে পাঠাই। পূর্ব শত্রুতার কারণে ওরা আগে থেকেই পরিকল্পনা করে আমার ছেলেকে হত্যা করেছে। আমি এর বিচার চাই।
নিহতের চাচা হাজী আব্দুস সাদেক বলেন,আমার ভাতিজাকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। আমরা সুষ্ঠু তদন্ত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।
ভৈরব উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের কর্তব্যরত চিকিৎসক উম্মে হাবিবা জুঁই জানান, গুরুতর আহত অবস্থায় ইমানকে হাসপাতালে আনা হয়। তার অবস্থার অবনতি হওয়ায় উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় পাঠানোর প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছিল, তবে তার আগেই তিনি মারা যান।

ঘটনার পর নিহতের বাবা ইসাক মিয়া বাদী হয়ে ভৈরব থানায় ৭৯ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাত আরও ১০-১৫ জনকে আসামি করে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছেন।
এ বিষয়ে ভৈরব উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কে এম মামুনুর রশিদ বলেন, হত্যাকাণ্ডের পর পাল্টাপাল্টি ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে। স্থানীয়দের সহযোগিতা পেলে পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে।

ভৈরব থানার অফিসার ইনচার্জ মো. আতাউর রহমান আকন্দ বলেন, হত্যার ঘটনায় মামলা নেওয়া হয়েছে এবং আমরা গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করছি। ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনাতেও কারা জড়িত তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে, যেন নিরপরাধ কেউ হয়রানির শিকার না হয়।
বর্তমানে লুন্দিয়া গ্রামে থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। যেকোনো অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, দ্রুত দোষীদের গ্রেফতার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা না হলে পরিস্থিতি আরও অবনতি হতে পারে।
দৃশ্যপট নিউজ / NA





